খলিলুর রহমান ইমরান।। রোজা (ফার্সি روزہ) সাওম (আরবী صوم অর্থ: সংযম), বা সিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয় ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ, (فرض) যার অর্থ অবশ্য পালনীয়।
রোজা সম্পর্কিত কোরআন ও হাদিস
ইসলামের ৫টি স্তম্ভের মধ্যে সিয়াম বা রোজা অন্যতম একটি স্তম্ভ। হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তা`য়ালা রোজার প্রতিদান নিজ হাতে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
কোরআন মাজীদ
يٰٓـاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْکُمُ الصِّيَامُ کَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَۙ
১। হে মু’মিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হইল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হইয়াছিল, যাহাতে তোমরা মুত্তাকী হইতে পার-
(সূরা বাকারা আয়াত ১৮৩)
اَيَّامًا مَّعْدُوْدٰتٍؕ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِيْضًا اَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَيَّامٍ اُخَرَؕ وَعَلَى الَّذِيْنَ يُطِيْقُوْنَهٗ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِيْنٍؕ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهٗ ؕ وَاَنْ تَصُوْمُوْا خَيْرٌ لَّـکُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ
২। সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। তোমাদের মধ্যে কেহ পীড়িত হইলে বা সফরে থাকিলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করিয়া লইতে হইবে। ইহা যাহাদেরকে সাতিশয় কষ্ট দেয় তাহাদের কর্তব্য ইহার পরিবর্তে ফি-দিয়া একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা। যদি কেহ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সৎকাজ করে তবে উহা তাহার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ যদি তোমরা জানিতে।
(সূরা বাকারা আয়াত ১৮৪)
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْٓ اُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَ بَيِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰى وَالْفُرْقَانِۚ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَـصُمْهُ ؕ وَمَنْ کَانَ مَرِيْضًا اَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَيَّامٍ اُخَرَؕ يُرِيْدُ اللّٰهُ بِکُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيْدُ بِکُمُ الْعُسْرَ وَلِتُکْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُکَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰى مَا هَدٰٮكُمْ وَلَعَلَّکُمْ تَشْكُرُوْنَ
৩। রমজান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী রূপে কুরআন অবতীর্ণ হইয়াছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাহারা এই মাস পাইবে তাহারা যেন এই মাসে সিয়াম পালন করে। এবং কেহ পীড়িত থাকিলে কিংবা সফরে থাকিলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করিবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যাহা সহজ তাহা চাহেন এবং যাহা তোমাদের জন্য কষ্টকর তাহা চাহেন না এই জন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করিবে এবং তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করিবার কারণে তোমরা আল্লাহ্র মহিমা ঘোষণা করিবে এবং যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পার। (সূরা বাকারা আয়াত ১৮৫)
اُحِلَّ لَـکُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ اِلٰى نِسَآٮِٕكُمْؕ هُنَّ لِبَاسٌ لَّـكُمْ وَاَنْـتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ؕ عَلِمَ اللّٰهُ اَنَّکُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُوْنَ اَنْفُسَکُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْۚ فَالْـــٰٔنَ بَاشِرُوْهُنَّ وَابْتَغُوْا مَا کَتَبَ اللّٰهُ لَـكُمْ وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا حَتّٰى يَتَبَيَّنَ لَـكُمُ الْخَـيْطُ الْاَبْيَضُ مِنَ الْخَـيْطِ الْاَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِؕ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّيَامَ اِلَى الَّيْلِۚ وَلَا تُبَاشِرُوْهُنَّ وَاَنْـتُمْ عٰكِفُوْنَ فِى الْمَسٰجِدِؕ تِلْكَ حُدُوْدُ اللّٰهِ فَلَا تَقْرَبُوْهَا ؕ كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللّٰهُ اٰيٰتِهٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ
৪। সিয়ামের রাত্রে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হইয়াছে। তাহারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাহাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ্ জানেন যে, তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করিতেছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হইয়াছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করিয়াছেন। সুতরাং এখন তোমরা তাহাদের সঙ্গে সংগত হও এবং আল্লাহ্ যাহা তোমাদের জন্য নির্ধারণ করিয়াছেন তাহা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হইতে ঊষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়। অতঃপর নিশাগম পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাহাদের সঙ্গে সংগত হইও না। এইগুলি আল্লাহ্ সীমারেখা। সুতরাং এইগুলির নিকটবর্তী হইও না। এইভাবে আল্লাহ্ তাঁহার বিধানাবলী মানব জাতির জন্য সুস্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করেন, যাহাতে তাহারা মুত্তাকী হইতে পারে। (সূরা বাকারা আয়াত ১৮৭)
রোজা কত প্রকার কি কি ও তার বিধান কি?
রোজা সাত প্রকার ১। ফরজ ২। ওয়াজিব ৩। সুন্নাত ৪। মুস্তাহাব ৫। নফল ৬। মাকরূহ ৭। হারাম
ফরজ রোজা আবার চার প্রকার- ক. রমজান মাসের রোজা। খ. কোনো কারণ বশত রমজানের রোজা ভঙ্গ হয়ে গেলে তার কাযা আদায়ে রোজা। গ. শরীয়তে স্বীকৃত কারণ ব্যতিত রমজানের রোজা ছেড়ে দিলে কাফফারা হিসেবে ৬০টি রোজা রাখা। ঘ. রোজার মান্নত করলে তা আদায় করা।
মান্নতের রোজা আবার দু’প্রকার। এক. নজরে মুআইয়ান অর্থাৎ কেউ কোনো কিছুর প্রত্যাশা করে যদি সুনির্দিষ্ট দিন তারিখ উল্লেখ করে রোজার নিয়ত করে। দুই. নজরে গাইরে মুয়াইয়ান অর্থাৎ অনির্দিষ্ট দিন তারিখ উল্লেখ করে রোজার নিয়ত করে। দু’টিই পরবর্তীতে রাখা ফরজ। কেউ কেউ এগুলোকে রাখা ওয়াজিবও বলেছেন।
দুই. ওয়াজিব রোজা:
ওয়াজিব রোজা বলা হয়, নফল রোজা রেখে ভঙ্গ করলে পরবর্তীতে তা আদায় করা ওয়াজিব।
তিন. সুন্নাত রোজা :
মহররম মাসের নয় এবং দশ তারিখে রোজা রাখা। কেউ কেউ বলেছেন, সাওমে দাউদ অর্থাৎ দাউদ (আ.) যে পদ্ধতিতে রোজা রাখতেন এ সব পদ্ধতিতে রোজা রাখা সুন্নত। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন রোজা রাখতেন না। গ্যাপ গ্যাপ দিয়ে রোজা রাখতেন। এভাবে রোজা রাখা সুন্নাত।
চার. মুস্তাহাব রোজা :
প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, এবং ১৫ তারিখে, প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার, কোনো কোনো ইমামের মতে শাওয়াল মাসে পৃথক পৃথক প্রতি সপ্তাহে দু’টি করে ছয়টি রোজা রাখা মুস্তাহাব। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে এক সঙ্গে হোক কিংবা পৃথক পৃথক হোক শাওয়ালের ছয়টি রোজা মাকরূহ।
পাঁচ নফল রোজা:
মুস্তাহাব আর নফল খুব কাছাকাছির ইবাদত। সহজ অর্থে নফল হলো যা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত নয় এমন ইবাদত পূণ্যের নিয়তে করা। রোজার ক্ষেত্রেও তাই।
ছয়. মাকরূহ রোজা :
মাকরূহ হচ্ছে বছরের ৩৬৫ দিনের ৩৬৫ দিন রোজা রাখা।
সাত. হারাম রোজা :
বছরের ছয়দিন রোজা রাখা হারাম। যেমন : আইয়াম তাশরিকের পাঁচ দিন অর্থাৎ জিলহজ মাসের ৯. ১০, ১১, ১২, ১৩ তারিখ রোজা রাখা হারাম। আর ঈদুল ফিতরের দিন রোজা রাখা। বছরের এ ছয়দিন রোজা রাখা হারাম। এসব দিনগুলোতে রোজা রাখা যায় না।
এসব রোজার নিয়তের বিধান :
রোজার নিয়ত করা ফরজ। ফরজ হোক, ওয়াজিব হোক, সুন্নাত হোক সকল রোজার ক্ষেত্রেই নিয়ত ফরজ। রোজার নিয়ত করতে হবে রাতেই। তবে কেউ রাতে নিয়ত করতে না পারলে দিনের এগারোটার পূর্বেই রোজার নিয়ত করার সুযোগ আছে। তবে এটা সব রোজার জন্য নয়। রমজানের রোজা বা ফরজ রোজার নিয়ত যদি কোনো ব্যক্তি রাতে করতে না পারে তাহলে দিনের এগারোটার মধ্যে নিয়ত করলেও চলবে। নফল রোজার ক্ষেত্রেও একই সুযোগ রয়েছে। তবে যদি কোনো ব্যক্তি নজরে গাইরে মুয়াইআন অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট দিনের মান্নত করেনি তাদের ক্ষেত্রে রাতের বেলা রোজার নিয়ত করতে হবে এবং যারা রমজানের রোজা রাখেননি, রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে যদি এ রোজা রাখতে চায় তাহলেও রাতের বেলা নিয়ত করতে হবে। সকালে নিয়ত করলে হবে না।
রোজা ফরজ হওয়ার শর্ত :
১. মুসলিম হওয়া। অমুসলিমের ওপর রোজার বিধান নেই।
২. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের ওপর রোজা ফরজ নয়।
৩. জ্ঞান সম্পর্ণ হওয়া। অর্থাৎ মস্তিষ্ক বিকৃত (পাগল) লোকের ওপর রোজা ফরজ নয়।
৪. হায়েয তথা ঋতুকাল এবং নিফাস তথা সন্তান জন্মদান পরবর্তী সময়ে পবিত্র থাকা। নারীদের হায়েজ ও নিফাসের সময়ে রোজা রাখা যাবে না। হায়েজ-নিফাসের কারণে যে কয়টা রোজা ভঙ্গ হবে, তা পরবর্তীতে কাজা করে নিতে হবে।
৫. রোজা পালনে সামর্থবান হওয়া।
৬. শরয়ী মুসাফির না হওয়া। কারণ মুসাফিরের জন্য রোজা ফরজ নয়।
হাদিস শরীফ
১। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও পর্যালোচনা সহ রমজান মাসের রোজা পালন করবে, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুণাহ মাফ করে দেওয়া হবে। ( বুখারী, মুসলিম)
২। হযরত সাহল বিন সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন, জান্নাতের একটি দরজা আছে, একে রাইয়ান বলা হয়,। এই দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন একমাত্র রোজা পালনকারী ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ এই পথে প্রবেশ করবে না। সেদিন এই বলে আহ্বান করা হবে রোজা পালনকারীগণ কোথায় তারা যেন এই পথে প্রবেশ করে। এভাবে সকল রোজা পালনকারী ভেতরে প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। অত:পর এ পথে আর কেউ প্রবেশ করেবে না। (বুখারী মুসলিম)
৩। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন, রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ কোনোদিন রোজা পালন করলে তার মুখ থেকে যেন অশ্লীল কথা বের না হয়। কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে অথবা ঝগড়ায় প্ররোচিত করতে চায় সে যেন বলে, আমি রোজা পালনকারী। ( বুখারী মুসলিম)
৪। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা`য়ালা বলেছেন, রোজা ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব। রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজা পালনকারী। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তার শপথ! অবশ্যই রোজা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের গন্ধের চেয়েও সুগন্ধি। রোজা পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি খুশি, যা তাকে খুশি করে। যখন যে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সাওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে। (বুখারী, মুসলিম)
৫। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, তোমাদের নিকট রমজান মাস উপস্থিত। এটা এক অত্যন্ত বরকতময় মাস। আল্লাহ তা’য়ালা এ মাসে তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায়, এ মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এ মাসে বড় বড় শয়তানগুলোকে আটক রাখা হয়। আল্লাহর জন্য এ মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও অনেক উত্তম। যে লোক এ রাত্রির মহা কল্যাণ লাভ হতে বঞ্চিত থাকল, সে সত্যিই বঞ্চিত ব্যক্তি। (নাসায়ী)
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply