এ কথার জবাব হল, কুরআন ও হাদিসের কোথাও শবে বরাত থাকবে কেন, শবে বরাত কুরআন ও হাদীসের পরিভাষা নয়। যেমন: নামাজ, রোযা, ফেরেস্তা এগুলো কুরআন ও হাদিসের পরিভাষা নয়। কুরআনে লাইলাতুম মুবারকা। হাদিসে লাইলাতুন নিসফী মিন শাবান।
কোরআন ও প্রসিদ্ধ তাফসীরের আলোকে শবে বরাত
আল্লাহ এরশাদ করেন- হা-মীম, এ স্পষ্ট কিতাবের শপথ নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে বন্টন করে দেওয়া হয় প্রত্যেক হিকমতের কাজ। (সূরা দুখান, আয়াত নং ১-৪)
এ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বিশ্ব বরেণ্য মুফাচ্ছিরগণের মতামত: ১.মালেকী মাযহাবের আল্লামা শেখ আহমদ ছাভী বলেন- ঐ বরকতময় রজনী হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত্রি (মুফাচ্ছিরীনে কেরামের অন্যতম মুফাচ্ছির) বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা ( রহ.)ও অন্যান্য তাফসীরকারকদের একদলের অভিমত। তারা এর কয়েকটি কারণও উল্লেখ করেছেন। শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত্রির চারটি নামে নামকরণ করেছেন।
যেমন- ১। লাইলাতুম মুবারাকাহ- বরকতময় রজনী। ২। লাইলাতুল বারাআত- মুক্তি বা নাজাতের রাত্রি। ৩। লাইলাতুর রহমাহ- রহমতের রাত্রি। ৪। লাইলাতুছ ছাক- সনদপ্রাপ্তির রাত্রি ইত্যাদি। (তাফসীরে ছাভী)
২.তাফসীরে জালালাইন শরীফে রয়েছে-নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর বরকতময় রাত হল লাইলাতুল ক্বদর (ক্বদরের রাত) অথবা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত)। কেননা এই রাতে উম্মুল কিতাব (কোরআন মাজিদ) ৭ম আসমান থেকে দুনিয়ার আসমানে (১ম আসমান) নাযিল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। (তাফসীরে জালালাইন )
৩.তাফসীরে তাবারীতে রয়েছে- আল্লাহ তা`য়ালার বাণী এর তাফসীরে বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা (রহ.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন মধ্যে শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চুড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজীদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে একজনও কম বেশি হয় না। (তাফসীরে তাবারী)
৪. প্রসিদ্ধ তাফসীরে কুরতুবী রয়েছে- ইমাম কুরতুবী (রহ.)বলেন, এ রাতের ৪ টি নাম আছে- (ক). লাইলাতুম মুবারাকা, (খ). লাইলাতুল বারাআত, (গ). লাইলাতুছ্ ছাক (ঘ). লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান। (তাফসীরে কুরতুবী)
৫.তাফসীরে বাগভীতে বর্ণিত আছে- নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে সকল বিষয়ের চুড়ান্ত ফয়সালা করেন এবং শবে ক্বদরের রাতে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করেন । (তাফসীরে বাগভী)
হাদীস শরীফের আলোকে লাইলাতুল বরাতের
দলীল নং : ১
হযরত আবূ মূসা আশয়ারী (রা.) রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেন। রাসূল (সা.) এরশাদ করেন- মধ্যে শাবানের রাত্রিতে আল্লাহ পাক রহমতের তাজাল্লী ফরমান এবং তার সমস্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রুতাপোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না।
দলীল: ২
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল ( রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম ( সা.) বলেন, মধ্যে শাবানের রাত্রিতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে জালওয়া রাখেন, অত:পর তাঁর সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রুতাপোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না।
দলীল নং : ৩
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসুল (সা.) হতে বর্ণনা করেন রাসুল (সা.) হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন- হে আয়েশা! শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা ও বুযুর্গী সম্পর্কে তুমি কি জান? তিনি আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.) শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতের কি মর্যাদা রয়েছে? আল্লাহ হাবিব (সা.) উত্তরে বললেন- আগামী এক বছরে কতজন আদম সন্তান ভূমিষ্ট হবে এবং কতজন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করবে তা এ রাত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাত্রিতে তাদের আমল মহান আল্লাহ দরবারে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের রিজিক অবতীর্ণ কিংবা নির্ধারণ করা হয়। অত:পর হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) “আল্লাহ রহমত ছাড়া কারো পক্ষে কি জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়? রাসূল (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ বিশেষ রহমত ও একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া কারো পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কথাটি রাসূল (সা.) তিনবার বললেন।
শবে বরাতের নামাজ, রোজা, আমল ও ফজিলত
হাদিসে এসেছে, হযরত আয়েশা (র) বলেন, রাসূল (সা.) তাকে বলেছেন,
এই রাতে আল্লাহ ভেড়া বকরীর পশমের সংখ্যার পরিমানের চেয়েও বেশি সংখ্যা পরিমাণ গুনাহ্গারকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি)
শাবান মাস আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলার নির্ধারিত ১২ মাসের একটি অন্যতম মাস। এ মাসের রয়েছে অনেক ফজিলত ও মর্যাদা। এ মর্যাদার কারণেই রাসুল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন।
শবে বরাতের নামাজ কত রাকাত ও কিভাবে পড়বো?
শবে বরাতে নির্দিষ্ট পরিমান নামাজের কথা কোনো হাদিস এবং কুরআনে উল্ল্যেখ নেই। তবে হাদিসে পাওয়া যায়, রাসূল (সঃ) বলেন,
যখন শাবানের মধ্য দিবস আসবে তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদাত করবে এবং দিনে রোজা পালন করবে। ইবাদাতের মধ্যে শ্রেষ্ট ইবাদাত হল নামাজ। সুতরাং নফল ইবাদাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদাত হল নফল নামাজ। (ইবনে মাজাহ )
তাই দুই রাকাত করে যত খুশি নামাজ পড়তে পারেন। নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। এখন নিয়ত করবেন কিভাবে? বলবেন আমি কিবলামুখী হয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ছি, আল্লাহু আকবার। এইভাবে নিয়ত করলে আপনার নামাজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। তবে এখানে সূরাতুল ফাতিহা পড়ার পর তিন বার সূরা ইখলাস বা সূরা ওয়াকিয়াহ পড়তে হবে এমন কোন কথা হাদিসে নেই। রাসূল (সা.) সুস্পষ্টভাবে এ ব্যাপারে কিছু বলেন নি। আপনি পবিত্র কুরআনের যেকোনো সূরাই পড়তে পারেন।
শবে বরাতের রোজা কয়টি ও কিভাবে রাখতে হয় ?
হাদিস শরীফে শবে বরাতের রোজার বিশেষ ফজিলত পাওয়া যায়। রাসূল (সা.) বলেনঃ ১৫ শাবানের রাতে তোমরা নফল ইবাদাত করো এবং পরদিন রোজা রাখ। এই হাদিস দিয়ে শবে বরাতের একটি নফল রোজা রাখা প্রমাণিত হয়।
তবে বিভিন্ন হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রত্যেক আরবী মাসের ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখে তিন দিন তিনটি রোজা রাখতেন এবং তিনি নফল রোজা রাখতে উৎসাহিত করেছেন। সে হিসেবে শাবান মাসে তিনটি রোজা রাখা যেতে পারে।
এ বিষয়ে অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, হযরত উম্মে সালমা ও হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন শাবান মাসে হযরত মুহাম্মদ (সা.) অধিকহারে রোজা রাখতেন। যেন তিনি গোটা শাবান মাসেই রোজা রাখতেন। (তিরমিজি)
সে হিসেবে শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অধিক সওয়াবের কাজ।
শবে বরাতের আমল ও ফজিলত
শবে বরাতের আমল অনেক ফজিলতপূর্ণ। আসুন জেনে নেই শবে বরাতে কি কি আমল করা যেতে পারে।
এশার নামাজের পর নির্জনে (বাসায় নফল নামাজ পড়া উত্তম) দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়তে থাকবেন। কত রাকাত পড়লেন তা মুখ্য নয় বরং কতটা মনোযোগ ও দীর্ঘ্য করলেন সেটাই মুখ্য বিষয়। হাদিস শরীফে আছে, হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একবার রাসূল (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এতো দীর্ঘ্য সিজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল নাড়া দিলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে উঠে নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন: হে আয়েশা তুমি কি আশঙ্খা হয়েছে? আমি বললাম ইয়া রাসূল (সা.) আপনার দীর্ঘ্য সিজদা দেখে আমার আশঙ্খা হয়েছিল আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। নবী (সা.) বললেনঃ তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) ভালো জানেন। তখন রাসূল (সা.) বলেনঃ এটা হলো মধ্য শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন। ক্ষমা পার্থনকারীদের ক্ষমা করে দেন। অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন, আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ঈমান)
এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে নামাজে অত্যন্ত মনোযুগী হতে হবে। এবং বেশি করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে আল্লাহ দুই ধরণের ব্যক্তি ছাড়া বাকিদের ক্ষমা করে দেন। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি শিরক করে এবং অন্ন ব্যক্তি হলো যে হিংসা করে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন এই দুই ব্যক্তিদের মধ্যে পরে না যাই।
হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবী করিম (সা.) বলেছেন ১৪ই শাবান দিবাগত রাত যখন আসে তোমরা এই রাতটি ইবাদাত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা এই দিনে আল্লাহ সূর্যাস্তের পর প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং আহ্বান করেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি যাদের আমি ক্ষমা করবো? কোনো রিযিক প্রার্থী আছো কি যাদের আমি রিজিক দিব? আছো কি কোনো বিপদগ্রস্ত যাদের আমি উদ্ধার করবো? এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ আহ্বান করতে থাকেন। সুবহানাল্লাহ (হাদীসটি ইবনে মাজাহ তে বর্ণিত আছে)
এ রাতে কাজা হয়ে যাওয়া নামায পড়তে পারেন। তবে শুধুমাত্র ফরজ ও বিতির নামাজের কাজা পড়বেন।
শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে পারেন। যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়।
বেশি করে তাওবা ও ইস্তেগফার করা।
বেশি করে দুরূদ শরীফ পাঠ করা।
বেশি করে তসবিহ পাঠ করা (সুবহানাল্লাহ , আলহামদুলিল্লাহ , আল্লাহু আকবার)
বেশি করে দান-সদকা করা। গরীব-মিসকিনদের সাহায্য করা।
ফজর নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা।
প্রতিবছরই শবে বরাত আসে। আসে মুক্তি ও ক্ষমার বার্তা নিয়ে। আল্লাহর ভয়ে কম্পমান হৃদয়ে এ রাতে তাওবার উদ্রেক হয়। তাওবাকারীর জন্য ক্ষমার সওগাত নিয়ে আসে শবেবরাত। পাপ আক্রান্ত মন এ রাতে পরিশুদ্ধ জীবনে ফেরার তাগিদ অনুভব করা করে।
Leave a Reply