শবে বরাত’ নামটির শাব্দিক বিশ্লেষণ
শবে বরাত নামটি একটি ফার্সি ও একটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। শব শব্দটি ফার্সি, অর্থ রাত আর বরাআত শব্দটি আরবি, অর্থ মুক্তি। দুটি মিলে অর্থ হয় মুক্তির রাত। যেহেতু এ রাতে অগণিত মানুষের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং বহু জাহান্নামিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয়, তাই এ রাতটি শবে বরাত’ বা মুক্তির রাত নামে পরিচিত। হাদীস শরীফে এ রাতটি ‘লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান’ (অর্ধ শাবানের রাত তথা ১৪ শাবান দিবাগত রাত) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি হাদীস
১ম হাদীস
عن معاذِ بنِ جبلٍ ٬ عنِ النَّبيِّ صلّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ ٬ قالَ : يطَّلِعُ اللهُ إلى خَلقِه في ليلةِ النِّصفِ مِن شعبانَ فيغفِرُ لجميعِ خَلْقِه إلّا لِمُشركٍ أو مُشاحِنٍ
অর্থ : হযরত মু’আজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা’আলা অর্ধ শা’বানের রাতে [শবে বরাতে] তাঁর সৃষ্টির প্রতি মনযোগী হন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
২য় হাদীস
عن عليِّ بنِ أبي طالبٍ رضي اللَّهُ عنهُ قالَ: قالَ رسولُ اللهِ صلّى اللهُ عليه وسلَّمَ إذا كانت ليلةُ النِّصفِ من شعبانَ فقوموا ليلَها، وصوموا نَهارَها، فإنَّ اللَّهَ يَنزِلُ فيها لغُروبِ الشَّمسِ إلى سماءِ الدُّنيا، فيقولُ: ألا من مُستغفِرٍ لي فأغفرَ لَه ! ألا مُسترزِقٌ فأرزقَهُ ألا مُبتلًى فأعافيَهُ ألا كذا ألا كذا حتّى يطلُعَ الفجرُ
অর্থ : হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধ শা’বানের রাত [১৪ শা’বান দিবাগত রাত] যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর প্রথম আসমানে আসেন এবং বলতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করবো। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দিব। আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দিবো। আছে কি এমন আছে কি এমন, এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বলতে থাকেন।
৩য় হাদীস
হযরত আ’লা ইবনুল হারিস (রহ.) থেকে বর্ণিত, উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রাদি. বলেন, একবার রাসূল (সা.) রাতে নামাযে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমার আশঙ্কা হলো তাঁর হয়তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে।
আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করে বললেন, হে আয়েশা! অথবা বললেন, ওহে হুমায়রা! তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রসূল সা. তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি ইন্তেকাল করেছেন কি না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি তখন বললেন,
هذهِ ليلةُ النِّصفِ من شَعبانَ، إنَّ اللهَّ عزَّ وجلَّ يَطَّلعُ على عِبادِه في ليلَةِ النِّصفِ مِن شَعبانَ، فيغفرُ للمستَغفرينَ، ويرحمُ المستَرحمينَ، ويُؤَخِّرُ أهلَ الحِقدِ كما هُمْ
“এটা হল অর্ধ শা’বাননের রাত। (শা’বাননের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত)। আল্লাহ তা’আলা অর্ধ শা’বাননের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।
এ রাতে করণীয় আমলসমূহ
উল্লেখিত হাদীসসমূহ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, এ রাতে ইবাদতের কোনো ধরণ নির্দিষ্ট নেই বরং এ রাতে এমন সব নেক আমল করা উচিৎ যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়। তাই এ রাতে আমরা নিম্মোক্ত আমলসমূহ করতে পারি।
এক. মাগরিব, এশা ফজরের নামায অবশ্যই জামাতের সাথে আদায় করা।
দুই.নফল নামাজ পড়া।এক্ষেত্রে অনির্ভরযোগ্য কিছু বই-পুস্তকে নফল ইবাদতের বিভিন্ন নিয়মের কথা লেখা আছে যেমন- এত রাক’আত পড়তে হবে, প্রতি রাক’আতে এই এই সূরা এতবার পড়তে হবে। অথচ সহীহ হাদীস শরীফে শবে বরাত, শবে কদর বা অন্য কোনো ফযীলতপূর্ণ রাতে এসব বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামায প্রমাণিত নেই।
তিন. তওবা করা। তওবা বলা হয় (১) কৃতপাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (২) সঙ্গে সঙ্গে এই পাপটি পরিহার করা (৩) ভবিষ্যতে এই পাপটি আর করবো না এই মর্মে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা (৪) বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তার হক আদায় করে কিংবা ক্ষমা গ্রহণ করে দায়মুক্ত হওয়া (৫) কোনো ফরয-ওয়াজিব ছুটে গিয়ে থাকলে মাসআলা অনুযায়ী তার কাযা কাফফারা আদায় করা। অতঃপর আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা এবং অন্তর থেকে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
চার. কুরআনে মাজীদ তেলাওয়াত করা, দুরূদ শরীফ পড়া, যিকির-আযকার করা ও ইস্তেগফার পড়া ইত্যাদি।
-‘ফযীলতপূর্ণ দু’টি ইস্তিগফার’-
-‘সায়্যিদুল ইস্তিগফার’-
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِي ، وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِالنِّعْمَةِ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي ، فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ
রাসূলু (সা.) ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সাথে দিনে ও রাতে এই ইস্তিগফার পড়বে এবং এ অবস্থায় যে কোনো সময় মারা যাবে, সে নিঃসন্দেহে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ، وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
ফযীলত : রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বিছানায় যাওয়ার পূর্বে এ ইস্তিগফার তিনবার পড়বে, আল্লাহ তা’আলা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন। যদিও তা সুমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয় বা গাছের পাতার মতো অগণিত হয় অথবা ‘আলেজের’ মরুও বালুকারাশির সমপরিমাণ হয় কিংবা দুনিয়ার যত দিবসসমূহের সমপরিমাণ হয়।
পাঁচ. এ রাতে গুরুত্ব সহকারে দু’আ করা, কারণ এ রাতে দু’আ কবুল হওয়ার কথা বার বার ধ্বনিত হয়েছে।
ছয়. এ রাতে কিছু দান সদকা করে এবং নফল ইবাদত করে মৃতদের জন্যে সাওয়াব পৌঁছানো।
সাত. ১৫ শা’বান নফল রোযা রাখা। রোযা রাখার বিষয়টি উল্লিখিত হাদীস ছাড়াও অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
আট. সালাতুত তাসবীহ্ আদায় করা যেতে পারে। সালাতুত তাসবীহের নিয়ম কোনো আলেম থেকে জেনে নিতে হবে।
এ রাতের নফল আমলসমূহ সম্মিলিত নয়, ব্যক্তিগত
আল্লাহ তা’আলার সাথে একান্ত হয়ে একাকি সম্পর্ক গড়ার অন্যতম মাধ্যম হলো নফল ইবাদত। আর বিশুদ্ধ মতানুসারে নফল ইবাদত দলবদ্ধভাবে জামাতের সাথে নয় বরং একাকী করাই উত্তম। ফরয নামায তো অবশ্যই মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বে এবং এটিই উত্তম পন্থা। কারণ ঘরকে ইবাদত শূন্য করা নিষেধ। সুতরাং বর্তমানে শবে বরাত, শবে কদরকে কেন্দ্র করে যে প্রচলন দেখা যাচ্ছে যে, এই রাতে নফল ইবাদতের জন্য লোকজন দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হয়, কোথাও মিলাদ হয়, কোথাও এক সঙ্গে বসে জোরে জোরে যিকির হয়, যার দরুণ একাকি ইবাদতকারীর ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
অথচ এ রাতে এগুলো করার কোনো প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবয়ে তাবেঈনের যুগেও এর কোনো প্রচলন ছিল না। তবে যদি বাসায় অলসতার দরুণ ইবাদত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেক্ষেত্রে মসজিদে এসে ইবাদত করতে দোষ নেই। এক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না।
এ রাতেও যারা বঞ্চিত থেকে যায়
হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী কিছু লোক এমন রয়েছে যারা এই সাধারণ ক্ষমার রাতেও ক্ষমা পায় না। যতক্ষণ না তাওবা করে ফিরে আসে। হাদীসের আলোকে এরা হলো :-
১. আল্লাহ তা’আলার সাথে অংশীদার স্থাপনকারী মুশরিক।
২. হিংসুক।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।
৪. যে পুরুষ টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরতে অভ্যস্ত।
৫. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্ধান।
৬. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি।
৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারী।
শবে বরাতে বর্জনীয় বিষয়
শয়তান মানুষকে এই রাতে নেক আমল থেকে বিরত রাখার জন্য কিছু কুসংস্কারের প্রচলন ঘটিয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো কিছু মানুষ এগুলোকে নেক কাজ মনে করে শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে। এ জাতীয় কিছু কুসংস্কারমূলক কাজ হলো-
১. আতশবাজী, পটকা ইত্যাদি ফুটানো ও তারাবাতি জ্বালানো।
২. মসজিদ, ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট ও অন্যান্য জায়গায় আলোকসজ্জা করা। এসব অপচয়ের শামিল। তাছাড়া এটি বিধর্মী এবং হিন্দু দেওয়ালী উৎসবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে অবশ্যই পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। হাদীস শরীফে এসেছে রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত হবে।
৩. হালুয়া-রুটি, খিচুরী পাকানো। এ সবকে এ রাতের বিশেষ কাজ মনে করা হয়। মা-বোনদের দামি সময় নষ্ট হয়, মসজিদে হৈ চৈ ও শোরগোল হয়। ইবাদত করার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং এ সবের পিছনে পড়ে এ রাতের তাওবা-ইত্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি ছুটে যায়।
সুতরাং এগুলোও পরিহার করা আবশ্যক। এক কথায় এ রাতে আনুষ্ঠানিকতা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ বর্জন করে নিবিড়ভাবে নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা উচিৎ, যাতে আমরা বরকতপূর্ণ রাতের বরকত লাভে ধন্য হয়ে আল্লাহর সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ রাতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে একাগ্রতার সাথে তাঁর ইবাদত করার তৌফিক দান করেন। আমীন ইয়া রব
লেখক
মাওলানা ইমরান আহমদ উসমানী
শিক্ষক, সাংবাদিক, ইসলামিক আলোচক
ইমাম ও খতিব হাসানপুর জামে মসজিদ বানিয়াচং হবিগঞ্জ
শিক্ষা সচিব নুরুল কোরআন মাদরাসা মজলিশপুর বানিয়াচং হবিগঞ্জ
নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক সেরাকন্ঠ
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply