জুমাতুল বিদা মুসলিম সংস্কৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ দিবস। জুমাতুল বিদা আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো সমাপনি সম্মিলন।
ইসলামের পরিভাষায় সিয়াম সাধনার মাস রমজানের শেষ শুক্রবারকে ‘জুমাতুল বিদা’ বলে। এ দিবসকে এতদঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মানুষ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। একে কেন্দ্র করে প্রতিটি মুসলিম মনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। বলতে গেলে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনাশেষে মুসলিম মনে যে ঈদুল ফিতরের আগমন ঘটে, তারই আগমন জানান দেয় জুমাতুল বিদা।
বস্তুত ইসলামি সংস্কৃতির একটি বিরাট অংশ দখল করে আছে জুমা দিবস। প্রতি সপ্তাহের জুমা দিবসে মুসলিম মনে এক জাগরণ সৃষ্টি হয়। এ জাগরণে অংশগ্রহণ করে পরবর্তী সপ্তাহের কর্মকৌশল ও কর্তব্য স্থির করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ছুটি পালন হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি পালন হয়ে আসছে। এ দিবসটিকে কেন্দ্র করে থাকে অনেক বিনোদন, অনেক আসর-আড্ডা।
জুমার দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদার সহজ উপমা হলো এ দিবসকে কেন্দ্র করে পবিত্র কুরআনে ‘জুমা’ নামে স্বতন্ত্র একটি সুরা নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘জুমাতুল বিদা’ তন্মধ্যে যেন সোনায় সোহাগা। এক হাদিসে জুমা দিবসকে সাপ্তাহিক ঈদস্বরূপ বলা হয়েছে। সে হিসেবে প্রতি বছরের বড় দুটি ঈদ তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগমনীবার্তা ঘোষণা করার জন্য প্রতি সপ্তাহের জুমাবার মিলে মোট বায়ান্নটি দিবস নির্ধারিত রয়েছে। তন্মধ্যে সবচে গুরুত্বের দাবিদার ‘জুমাতুল বিদা’। জুমাতুল বিদাকে সকল জুমার সেরা জুমা বলা হয়।
চলতি রামাদান মাসের শেষ জুমাবার আজ। মুসলিম বিশ্বে রমজান মাসের শেষ জুমাবারটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম বিশ্ব রামাদান মাসের শেষ জুমাবারকে আল কুদস দিবস হিসেবে পালন করে।
বাংলাদেশে রামাদান মাসের শেষ জুমাকে জুমাতুল বিদা হিসেবে পালন করা হয়। ইসলামে আলাদাভাবে জুমাবারের বিভিন্ন ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে।
জুমার ফযিলত ও বরকতঃ
যেমন হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (দঃ) আমাদের সঙ্গে একদিন জুমাবারের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় থাকে এবং আল্লাহতায়ালার কাছে কিছু চায়, আল্লাহতায়ালা অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুলুল্লাহ (দঃ) তার হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন।’ সহিহ বোখারি ইসলামী স্কলাররা ওই সময় সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘ইমামের মিম্বরে বসার সময় থেকে নামাজ শেষ করা পর্যন্ত সময়টিই সেই বিশেষ মুহূর্ত।’ (সহিহ মুসলিম শরীফ)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বর্ণনা করেন, ‘জুমাবারে আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া কবুল হয়।’
বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ যাদুল মায়াদে বর্ণিত আছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়।
জুমার দিনের বিশেষ সেই মুহূর্ত সম্পর্কে বলা হয়েছে, জুমার নামাজে সুরা ফাতিহার পর আমিন বলার সময়, আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়, মুয়াজ্জিন আজান দেওয়ার সময়, জুমার দিন সূর্য ঢলে পড়ার সময়, ইমাম খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে দাঁড়ানোর সময়। উভয় খুতবার মধ্যবর্তী সময় ও জুমার দিন ফজরের আজানের সময়। সুতরাং শুক্রবারের আলাদা গুরুত্বের কথা স্বীকৃত।
অন্যদিকে রামাদান মাসের শেষ জুমাবারকে বিশ্ব কুদস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ফিলিস্তিন ও পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাসের দখলদার ইহুদিদের হাত থেকে মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা মসজিদকে মুক্ত করার জন্য মুসলমানদের জাগিয়ে তোলা এ দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
জুমার প্রামাণ্যঃ
পবিত্র কোরআনে জুমার নামাজ জামাতে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে,
‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।’ (সূরা আল-জুমুআ, আয়াত-৯)
জুমাতুল বিদার তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য সর্বাধিক। জুমার নামাজ অপরিহার্যভাবে জামাতের সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক বিধায় একাকী পড়ার বিধান নেই। রামাদান মাসের সর্বোত্তম দিবস হলো জুমাতুল বিদা, যা মাহে রামাদানে পরিসমাপ্তিসূচক শেষ জুমাবারে পালিত হয়। এদিন মুমিন মুসলমানদের ইমানি সম্মিলন হয়। এদিনে এমন একটি সময় আছে যে সময় মুমিন বান্দার মোনাজাত ও ইবাদত আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন।
দোয়া কবুলের সময়ঃ
এ সময়টি হলো দ্বিতীয় খুতবার আজানের সময় থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলেছেন, ‘সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমাবার সর্বাধিক মর্যাদাবান ও নেতৃত্বস্থানীয় দিন। এ পুণ্য দিনে আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এদিন তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। এদিন তিনি পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করেন। এদিন তাঁর ইন্তেকাল হয়। এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ পুণ্য দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যে সময় আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হয়।’ (মিশকাত শরীফ)
সতর্কতার স্বরণঃ
মাহে রামাদানের বিদায়ী জুমাবার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অতি মূল্যবান। এদিন সিয়াম শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কতামূলক দিবস। জুমাতুল বিদা স্মরণ করিয়ে দেয় যে রোজার শেষ প্রান্তে এর চেয়ে ভালো দিবস আর পাওয়া যাবে না। রোজার শুরু থেকে যেসব ইবাদত ব্যস্ততাবশত ফেলে রাখা হয়েছে, যে গুনাহখাতা মাফের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে ভুল হয়েছে, জুমাতুল বিদার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সময়ে এর বরকত হাসিল করা বাঞ্ছনীয়।
আল কুদসের গুরুত্বঃ
জেরুজালেম শহরের অপর নাম ‘কুদস’ বা ‘আল কুদস’।
১.জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মোকাদ্দাস হলো মুসলমানের প্রথম কেবলা। মুসলিম ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অসংখ্য নবী-রাসুলের (দঃ) পদধূলিতে ধন্য এই নগরী।
২.মিরাজ রজনীতে এই মসজিদেই হযরত রাসুলুল্লাহ (দঃ) সব নবীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নামাজের ইমামতি করেছিলেন।
৩.হযরত সোলায়মান (আ.) সর্বপ্রথম এই
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
সংবাদ প্রতিদিন
৩.হযরত সোলায়মান (আ.) সর্বপ্রথম এই মসজিদ নির্মাণ করেন। অসংখ্য নবী-রাসুলের দাওয়াতি মিশন পরিচালিত হয়েছে এই মসজিদকে কেন্দ্র করে। জেরুজালেম নগরী বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থান। সব ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এই নগরীকে শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় বায়তুল মোকাদ্দাস ও জেরুজালেম নগরীতে মুসলমানদের অবাধ বিচরণ নিষিদ্ধ। নিজেদের পবিত্র স্থানে যেতে তারা বাধাপ্রাপ্ত হয় প্রতিনিয়ত। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদীদের সূক্ষ্ম চালের কারণে ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। সারা বিশ্বের মুসলমানরা তাকিয়ে আছেন ফিলিস্তিনের দিকে। কবে মুক্ত হবে আল কুদস। কবে মুসলমানরা আবার তাদের পুণ্যস্থান বায়তুল মোকাদ্দাসে স্বাধীনভাবে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারবেন। কুদস দিবস মুসলমানদের হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের চেতনাকে ক্রমেই শানিত করছে। মূলত আল কুদস দিবস এক মহাজাগরণের দিন। যে জাগরণের মূল চেতনা হলো মুসলিম ঐক্য।
ঈদের কেনাকাটার প্রস্তুতিঃ
আমাদের দেশে দীর্ঘ এক মাসের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গামধন্য মাহে রামাদান শেষে পশ্চিমাকাশের কোণে যে চিকন বাঁকা ঈদের চাঁদ উদিত হয়, তাকে কেন্দ্র করে প্রতিটি মানুষের মনে আনন্দের ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এ উপলক্ষে প্রতিটি মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক ক্রয় করে। সেমাই-ফিরনির সুঘ্রাণে চারদিক মৌ মৌ করে। মূলতঃ ঈদুল ফিতরের সকল আনন্দের ধারা শুরু হয় জুমাতুল বিদা তথা রমজানের শেষ জুমাবার হতে। জুমাতুল বিদার আলোচনায় মসজিদের ইমাম-খতিবগণ যখন রমজানকে বিদায় জানানোর ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য প্রদান করেন, তখন থেকেই শ্রোতাদের মন ঈদের কেনাকাটার জন্যে উৎসব করতে শুরু করে। নামাজ শেষে নতুন করে হিসেবের পালা শুরু হয় ঈদকে নিয়ে। ঈদের বাজার নিয়ে এতদিন যে গুঞ্জন মনের গভীরে ছন্দপতন ঘটাত, ঐদিন তা প্রকাশ্য তালিকায় রূপ নেয়। চূড়ান্ত তালিকা হয় ঈদের কেনাকাটার।
ঐতিহাসিক জুমাতুল বিদাঃ
জুমাতুল বিদা তথা রামাদানের শেষ জুমায় আমাদের দেশের প্রতিটি জুমা মসজিদে মুসল্লির উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এদিন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের উল্লেখযোগ্য মসজিদগুলোতে তিল ধরার ঠাঁই থাকে না। নামাজি মুসল্লিদের কাঁধে কাঁধ মিলানো কাতার চলে আসে রাজপথে। অনেক স্থানে এমনও দেখা যায় যে, ঈদের জামাতের চাইতেও জুমাতুল বিদার জামাত বড় হয়ে পড়ে। জুমাতুল বিদার বড় জামাতে অংশগ্রহণ করা এতদঞ্চলের মানুষজন বড় পুণ্যের মনে করে থাকে। ফলে গ্রাম কিংবা মফস্বল এলাকার বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ ছুটে আসে শহরের বড় বড় মসজিদের জুমাতুল বিদার জামাতে শরিক হতে। আতর-গোলাপের সুঘ্রাণ, সাদা পোশাক, মাথায় টুপি মিলে যেন এক বেহেশতি দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। ঈদের আগে এ যেন এক ভিন্ন রকমের ঈদ। অবস্থা এমন ঘটে যে, মুসলিম বিশ্বে ঈদ দুটি নয় তিনটি।
ইসলামে জুমাতুল বিদা’র সরাসরি গুরুত্ব বহনকারী কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও একে কেন্দ্র করে প্রতিটি যুগের মানুষের মাঝে একটা আলাদা গুরুত্বপূর্ণ ভাব লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিটি যুগের মুসলমানরাই জুমাতুল বিদাকে ভিন্নভাবে গুরুত্ব দিত। তবে হাদিসে সাধারণ জুমা দিবসের যেই গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে, জুমাতুল বিদার ফজিলত যে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি, তা যৌক্তিকভাবেই বলা যায়।
হাদিসের প্রমানঃ
হাদিসে এমনও বর্ণনা পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (দঃ) জুমাতুল বিদার খোতবায় ‘আল-বিদা-আল বিদা’ শব্দ উচ্চারণ করতেন। এ শব্দ শোনার পর সাহাবায়ে কেরাম একবার বিলাপ ধরে কান্না শুরু করেন। তারা বলতে লাগলেন রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তাবাহী মাহে রমজানকেই মূলত জুমাতুল বিদায় সম্ভাষণ জানানো হয়েছে। পরবর্তী রমজান ভাগ্যে জুটে কিনা এবং রমজানের মতো ক্ষমাপ্রাপ্তির মাসেও আমাদের বরাতে ক্ষমা জুটেছে কিনা- এসব আফসোসেই সাহাবায়ে কিরাম ক্রন্দনরোল চালু করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে জুমাতুল বিদার আগমন মানেই পুণ্যের মাস রমজানকে বিদায় জানানো।
সৃষ্টির শেষ ও বিশেষদিনঃ
তাফসিরের কিতাবসমূহে জুমা দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল ও সমস্ত জগতকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। এই ছয়দিনের শেষ দিন ছিল জুমার দিন। এ দিনেই আদি মানব হযরত আদম (আ) সৃজিত হন, এ দিনেই তাকে জান্নাতে দাখিল করা হয় এবং এ দিনেই জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামানো হয়। কেয়ামত এ দিনেই সংঘটিত হবে। জুমা দিবসে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যাতে মানুষ যে দোয়াই করে, তাই কবুল হয়।
যুগে যুগে জুমা পালনঃ
আল্লাহ তায়ালা প্রতি সপ্তাহে মানবজাতির সমাবেশ ও ঈদের জন্যে জুমা দিবস রেখেছিলেন। কিন্তু পূর্ববর্তী উম্মতরা তা পালন করতে ব্যর্থ হয়। ইহুদিরা ইয়াওমুস সাবত তথা শনিবারকে নিজেদের সমাবেশের দিন নির্ধারিত করে নেয়। খ্রিস্টানরা নেয় রোববারকে।
ইসলাম পূর্ব জুমা পালনঃ
তাফসিরে ইবনে কাসিরের বর্ণনা মতে, মূর্খতা যুগে জুমাবারকে ইয়াওমে আরূবা বলা হতো। আরবে কাব ইবনে লুওয়াই সর্বপ্রথম এর নাম ‘ইয়াওমুল জুমা’ রাখেন। এ দিবসে কুরাইশদের সমাবেশ হতো এবং কাব ইবনে লুয়াই এতে ভাষণ দিতেন। এটা রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর আবির্ভাবের পাঁচশত ষাট বছর পূর্বের ঘটনা। কাব ইবনে লুয়াই তার ভাষণে রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর আবির্ভাবের সুসংবাদও মানুষকে শুনিয়েছিলেন। সারকথা এই যে, ইসলাম পূর্বকালেও কাব ইবনে লুয়াইর আমলে জুমাবার দিনকে গুরুত্ব দান করা হতো। (মাজহারি)
জুমাতুল বিদাকে কেউ কেউ আখেরি জুমাও বলে থাকেন। রামাদান মাসের শেষ জুমাকে কবে থেকে জুমাতুল বিদা নামে বলা হয়ে আসছে, তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও ইতিহাস থেকে উদ্ধারকৃত তথ্যমতে, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাস ছিল রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর জীবনের শেষ রমজান। ঐ রমজান মাসের শেষ জুমাতেই প্রিয়নবী (সঃ) তার প্রদত্ত খোতবায় দু’বার ‘আল বিদা’ বলেন। এ শব্দ উচ্চারণ করে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম তার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ এটিই ছিল তার জীবনের সর্বশেষ রমজান মাস। পরবর্তী বছরের রবিউল আউয়াল মাসেই তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। তাই ঐ খোতবায় তিনি রমজানকে বিদায় জানাতে গিয়ে উম্মতের কাছ থেকে নিজের বিদায় হবার ঘোষণাই দিয়েছিলেন।
ইতিহাসে এমনও রয়েছে যে, ঐ বছর প্রিয়নবী (সঃ)-এর খোতবায় ব্যতিক্রমী ‘আল বিদা’ শব্
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
সংবাদ প্রতিদিন
ইতিহাসে এমনও রয়েছে যে, ঐ বছর প্রিয়নবী (সঃ)-এর খোতবায় ব্যতিক্রমী ‘আল বিদা’ শব্দটি শোনার পরই প্রধান সাহাবী হযরত আবু বকর (রা) ফুঁফিয়ে কেঁদে ওঠেন। সাহাবায়ে কেরাম তাকে এর কারণ সুধালে তিনি বলেন, ‘প্রিয়নবীজীর প্রস্থান আর বেশি দূরে নয়।’ মূলত হুজুর (সঃ)-এর মুখনিসৃত ‘আল বিদা’ শব্দ থেকেই পরবর্তীতে রমজানের শেষ জুমাকে জুমাতুল বিদা বলা হয়ে আসছে।
সম্মিলিত দোয়ার বরকতঃ
তাফসিরে ইবনে কাসিরের বর্ণনা মতে, জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যাতে যে দোয়াই করা হয়, তাই কবুল করা হয়। সহিহ হাদিসে এ কথা প্রমাণিত রয়েছে।
অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, কোনো ধর্মীয় মজলিসে যদি অন্তত চল্লিশজন লোক একত্রিত হয়ে কোনো দোয়া করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্যে যে কোনো একজনকে অলির মর্যাদা দিয়ে তার সঙ্গে সকলের দোয়া কবুল করে নেন। জুমাতুল বিদার বিশাল জামাতে আমাদের দেশের বিভিন্ন মসজিদে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাই ঐ দিনের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আর সাধারণ জুমার দিনেই সেখানে নির্দিষ্ট মুহূর্ত যে কোনো দোয়া করা হয়ে থাকে, সেখানে জুমাতুল বিদায় তো এ ফজিলত আরও উন্মুক্ত হওয়াই যুক্তিযুক্ত।
হাদিসের অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, রামাদান মাসে প্রতিদিন ইফতারপূর্ব সময়ে আল্লাহ তায়ালা সত্তর হাজার গুণাহগারকে ক্ষমা করে দেন। এ হিসেবে সমগ্র রমজানে যেই পরিমাণ গুনাহগারকে ক্ষমা করা হয় শুধুমাত্র জুমাতুল বিদা তথা আখেরি জুমায় সেই সংখ্যক ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয়। তাই এ দিনে প্রাণ খুলে আল্লাহর দরবারে রোজাদার ব্যক্তির প্রার্থনা করা উচিত।
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আসা পবিত্র মাহে রমজান বরকত ও প্রশান্তির ছায়ায় ঢেকে রেখেছিল বিশ্বচরাচর। মহানবী (সা.)-এর ভাষায় ‘তোমাদের উপর ছায়াপাত করছে এক মহান মাস।’ এ ছায়া এতই শীতল, এতই প্রাণবন্ত যে, ঈমানদারের হৃদয়মন তা অনুভব করে, তৃপ্তিতে ভরপুর হয় এবং নতুন করে জীবন লাভ করে প্রতি বছর রামাদান শরীফে। এ মাসে কোরআন নাজিল হয়। কোরআন এ মাসে পঠিতও হয় সবচেয়ে বেশি।
সর্বাধিক খতমে কুরআনের মাসঃ
মহানবী (দঃ) বলেছেন, ‘প্রতি রামাদানে জিবরাইল (আ.) এসে আমার সাথে কোরআন চর্চা করতেন। জীবনের শেষ বছর রমজানে দু’বার আমরা কোরআন আবৃতি করি।’ বিশ্বব্যাপী প্রায় দু’শ কোটি মুসলমান রমজানে কোরআন চর্চা করেছেন। শুধু বাংলাদেশেই কোটি কোটি খতম হয়েছে। শুধু মসজিদেই তারাবীর নামাজে কোরআন খতমের সংখ্যা ১০/১৫ লাখের কম নয়। হেজফখানা, খানকাহ, মাদরাসা, বাড়িঘর ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে খতমের সংখ্যা এর বাইরে।
রামাদান শরীফে যে কোন নফল ইবাদতের সওয়াব হয় ফরজের সমান আর ফরজের সওয়াব অন্তত ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। জামাতে নামাজের সওয়াব অন্য নামাজের তুলনায় ২৭ গুণ বেশি। এ হিসাবে জুমার নামায রমজানের ৭০ আর বড় জামাতের ২৭ গুণ মিলিয়ে কত যে পুণ্যময় হবে তা বলে বোঝানো যাবে না।
মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমা মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের মত। একটি রমজানে সাধারণত ৪ থেকে ৫টি জুমা পাওয়া যায়। শেষ জুমাটিকে মনে করা হয় রমজানের বিদায়ী ঘোষণা। বলা হয় জুমাতুল বিদা। এ জুমায় থাকে ঈমান আমলের মওসুম ও রহমত মাগফিরাতের সুসময় চলে যাওয়ার বেদনা। থাকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের প্রার্থনা, আবেগ ও উদ্দীপ্ত অনুভূতি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ভরদুপুরে দেশের সাড়ে চার লাখ মসজিদে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে জীবনের সার্থকতা কামনা করেন। পৃথিবীর প্রায় দু’শ’ কোটি মুসলমান এ দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উদযাপন করে। রোজা অবস্থায় জুমার নামাজে সমবেত হয়ে মহান আল্লাহর গুণগান, নবী করীম (দঃ)-এর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সালাম পেশ করে।
দীনি আলোচনা শুনে, দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজসহ বহু নফল নামাজ পড়ে, দান-খয়রাত ও দোয়া-মুনাজাত করে। এ যে নবী করীম (দঃ)-এর নির্দেশনারই প্রতিফলন, যেখানে বলা হয়েছে রামাদানের শুরুতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বান করা হয়। বলা হয়, হে কল্যাণের ধারক, অগ্রসর হও। হে শুভ কাজের কর্মী, এগিয়ে চল। আর মন্দের হোতা তুমি একটু থাম। অশুভ শক্তির ধারক, তুমি ধীরে চল।
কেননা এ মাসে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। তুমি মুক্তির পথে এসো। গজবের পথের যাত্রীরা একটু সংযত হও। থমকে দাঁড়াও। বলা তো যায় না তোমাকেও ক্ষমা করা হবে। পুণ্যবানরা এগিয়ে এসে ক্ষমা লাভ কর। পাপীরা একটু সংযত হয়ে হলেও ক্ষমার প্রার্থী হও।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জুমাতুল বিদাঃ
জুমাতুল বিদার তাৎপর্য, গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য এখানেই। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষ এখন বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছে। দুনিয়ার বড় বড় মসজিদগুলোর তারাবী, জুমা ও ঈদের জামাত এখন মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ দেখতে পারছে। আমেরিকার তারাবী, অস্ট্র্রেলিয়ার জুমা, ইউরোপের ঈদ জামাত, পূর্ব-পশ্চিম এবং গোটা মুসলিম বিশ্বের ইফতারী এখন মিডিয়ার প্রসারের যুগে ইসলামের জীবন্ত দাওয়াত। মহানবী (দঃ)-এর মানবিক, পুণ্যময় ও পবিত্রতাপূর্ণ সুন্নাহ বা সংস্কৃতির জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। রামাদানের রাতে আলোকোজ্জ্বল মরক্কোর বাদশাহ হাসান মসজিদ, আলজেরিয়ার জামে মসজিদ, মিসরের আল আজহার মসজিদ, দামেস্ক জামে মসজিদ, পবিত্র মক্কা ও মদীনার মহান দুই হারামাইন, ইসলামাবাদের বাদশাহ ফয়সাল মসজিদ, লাহোরের শাহী মসজিদ, দাতাসাহেব মসজিদ, দিল্লীর শাহী জামে মসজিদ, কলকাতার নাখোদা মসজিদ, ঢাকার মহাখালী গাউসুল আজম মসজিদ, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া মসজিদ, সিঙ্গাপুরের সুলতানী মসজিদ, জাকার্তার জাতীয় মসজিদ থেকে কী বার্তা আর বাণী পাওয়া যায়? মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর অনুসারী ২০০ কোটি ভক্ত তাদের মন-প্রাণ অনুভব নিবেদন করে যেভাবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও নাজাত কামনা করে তার কোন নজির কি কেউ দেখাতে পারবে? বিশ্বশান্তি, মানবতার মুক্তি ও মানুষ হিসেবে নিজ জনমকে সার্থক করার সাধনায় নিমগ্ন মুসলিম উম্মাহর এই প্রার্থনা, ইবাদত, নিবেদন ও পুণ্যময় উদযাপন কি বৃথা যেতে পারে? কখনই না। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা, তারাবীহ, কোরআন চর্চা, পুণ্যময় অনুশীলন, জুমার নামাজ, সাহরি, ইফতার, ফিতরা জাকাত, দান-খয়রাত, পাপবর্জন ঈদের আনন্দময় বার্তা বিশ্বমানবতার প্রতি মুসলিম উম্মাহর উম
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
সংবাদ প্রতিদিন
বিশ্বমানবতার প্রতি মুসলিম উম্মাহর উম্মুক্ত দাওয়াত।
আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান। মহানবী (দঃ)-এর আদর্শ, সংস্কৃতি ও শিক্ষার অনুসারী হওয়ার পথে প্রাণময় আকুতি। দুনিয়ার মানুষ শান্তি চাইলে ইসলামই তাদের সে পথ দেখাবে। ইহ ও পরজগতে পূর্ণাঙ্গ শান্তি, সাফল্য ও মুক্তি লাভের জন্য ইসলাম তাদের ডাকছে। এই মুক্তির আহ্বান আর শান্তির পয়গাম নিয়েই নাজিল হয় আল কোরআন। বাস্তবে রূপায়িত হয় মহানবী (দঃ)-এর জীবনকর্ম ও সাধনায় দীর্ঘ ২৩ বছরের সীরাতে রাসুলে। হাজার মাসের চেয়ে উত্তম একটি রাতে নাজিল হওয়া এ কালাম পেয়েই রামাদান ধন্য, মহিমান্বিত ও শ্রেষ্ঠ। এ রমজানের বিদায় বার্তা ঘোষণার আবেগঘন মুহূর্ত পবিত্র জুমাতুল বিদা। মহিমান্বিত বিদায়ী জুমা।
পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে যাওয়া লাখো মানুষ জুমাতুল বিদা আদায় করবেন মক্কার পবিত্র হারাম শরীফে। পড়বেন পাক মদিনায় মসজিদে নববীতেও। দুনিয়ার সবচেয়ে বড়জমায়েত মক্কা-মদিনায় হয়। উমরা করতে লাখো মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়। ইতেকাফ করে হাজারো মানুষ। রমজানের শেষ দশক আল্লাহর দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকার নাম ইতেকাফ। দুনিয়ার বহু শাসক, বিত্তবান, প্রভাবশালীই ইতেকাফে থাকেন। বিশ্বের লাখো মসজিদে কোটি মুসল্লি মসজিদে মসজিদে বসেছেন ইতেকাফে। নারীরা বসেছেন গৃহকোণে তাদের নামাজের স্থানে। শবে কদরের তালাশে তারা নিমগ্ন।
বাংলাদেশের কোটি কোটি মুসল্লী আবেগভরা উপস্থিতিতে ভরে তুলবেন লাখো মসজিদ। বান্দার পদভারে মুখরিত আসবে মসজিদ প্রাঙ্গণে, পার্শ্ববর্তী চত্বর, ফুটপাত রাজপথ ও খোলামাঠে আর দু’একরাত পরে শেষ হয়ে যাবে খতম তারাবীহর অনুপম দৃশ্য। করোনার মুক্তিই যেন প্রভুর নিকট বান্দার ফরিয়াদ। তিনিই পারেন মহামারীর অন্ধকার গহ্বর হতে তুলে আনতে।
সারাদেশে নানা শ্রেণী-পেশা ও পরিচয়ের কোটি নামাজি। এমন রোযা, ইফতার, সাহরি, তিলাওয়াত, তাসবি, জিকির, তারাবী, জামাত, জুমার ভরপুর পবিত্রতা যেন আরেকটি বছর পার হয়ে সবার জীবনে ফিরে আসে এই হল মূল প্রার্থনা। এত আবেগ, এত অনুভব মূলত আল্লাহর কাছে রহমত, মাগফিরাত, নাজাত, দীন-দুনিয়ার মঙ্গল, মানবজাতির শান্তির জন্য দোয়া। রামাদান সফল ও ফলপ্রসূ হোক। আরো রামাদান যেন ভাগ্যে জুটে। শবে কদর যেন পাওয়া যায়। এসব মুনাজাত নিয়েই পুষ্পিত ও মহিমান্বিত জুমাতুল বিদা।
পরিশেষে মুসলিম উম্মাহ সহ বিশ্ব এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রান্ত করছে। দুবছর যাবত মুসলিম গৃহে প্রকৃত জুমা ও ঈদের আমেজ ছিলনা। তাই আজকের জুমাতুল বিদা ও কুদস দিবসের ফরিয়াদ স্বাভাবিক জীবনের মুক্তি। আল্লাহ এ পবিত্র দিনের উসিলায় সকলকে মুক্তি দিন। আমিন।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply