সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় ধানের রং কালচে হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রং পরিবর্তিত হওয়া ধান সরকারি খাদ্যগুদামে নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে স্থানীয় ধানের ব্যবসায়ীরাও এসব ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কেউ কেউ কিনতে চাইলেও বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দাম প্রস্তাব করছেন। এতে উৎপাদন খরচ না ওঠায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর অতিবৃষ্টির কারণে শাল্লার বিভিন্ন হাওরে দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে বোরো ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় অনেক জমির ধানের রং কালচে হয়ে যায়। পরে কৃষকেরা নানা কষ্টে এসব ধান শুকিয়ে ঘরে তুললেও এখন বিক্রি করতে গিয়ে পড়েছেন নতুন সমস্যায়।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা জানান, ভালো মানের ধান বাজারে তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রি হলেও কালচে রঙের ধানের প্রতি ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ নেই। কেউ কেউ ধান কিনতে চাইলেও প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে ধান বিক্রি করলেও উৎপাদন খরচের বড় একটি অংশই উঠছে না। আবার সরকারি গুদামে ধান দিতে না পারায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ধান ঘরে মজুদ করে রেখেছেন।
বাহাড়া ইউনিয়নের পোড়ারপাড় গ্রামের কৃষক গৌরচান তালুকদার বলেন, “আমি ৪০ কেয়ার জমি চাষ করেছিলাম। কিন্তু সব ধানই কালো হয়ে গেছে। এখনো ধান বিক্রি করতে পারছি না। সরকারি গোডাউনেও দিতে পারছি না। এভাবে ধান ঘরে পড়ে থাকলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।”
একই সমস্যার কথা জানিয়ে শাল্লা ইউনিয়নের শ্রীহাইল গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, “আমি ৫০ কেয়ার জমি চাষ করেছিলাম। এখনো ঘরে প্রায় ৩০০ মণ ধান আছে। ধানের রং কালো হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার বেশি প্রতি মণ দাম বলতে চান না। তাই এখনো ধান বিক্রি করতে পারছি না। সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমরা কিছুটা হলেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতাম।”
শাল্লা উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক বকুল চন্দ্র বৈদ্য বলেন, “সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে, কালো ধান নেওয়া যাবে না। আমরা বিধি মোতাবেক ধান সংগ্রহ করছি।”
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় বলেন, “সরকার কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে থাকে। আর যে কালো ধানের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো সরকারি গোডাউনে সংগ্রহ করে পরবর্তীতে চাল করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরবরাহ করতে হয়। তাই সরকারি গুদামে ভালো মানের ধান মজুদ করতে হয়।”
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, “ধান ভালো না হলে চালও ভালো হয় না। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।”
তবে কৃষকদের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধানের রং পরিবর্তিত হওয়ার দায় কোনোভাবেই কৃষকদের নয়। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার কারণে ধানের এমন অবস্থা হয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এসব ধানের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা অথবা বিকল্প উপায়ে ধান বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
কৃষকেরা বলছেন, সময়মতো ধান বিক্রি করতে না পারলে ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি ধান বিক্রি করে পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ধান নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply