ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে বহু নির্দেশনা রয়েছে। শ্রমের প্রতি উৎসাহ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে
فَاِذَا قُضِيَتِ الصَّلٰوةُ فَانْتَشِرُوْا فِى الْاَرْضِ وَابْتَغُوْا مِنْ فَضْلِ اللّٰهِ وَاذْكُرُوا اللّٰهَ كَثِيْرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
অতঃপর যখন নামাজ পূর্ণ করা হবে, তখন জমিনে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করো, আশা করা যায় তোমরা সফল হবে। (সুরা জুমুআহ, আয়াত ১০)
হাদিস শরিফে এসেছে, ফরজ ইবাদতগুলোর পরেই হালাল উপার্জন ফরজ দায়িত্ব। (তিরমিজি)হালাল উপার্জনগুলোর মধ্যে তা সর্বোত্তম, যা কায়িক শ্রম দ্বারা অর্জন করা হয়।(মুসলিম)
ইসলামে শ্রমিক ও মালিক পরস্পরকে ভাই সম্বোধন করে মূলত ইসলাম শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্যের বিলোপ করেছে। তবে শ্রেণিবৈষম্য বিলোপের নামে মালিক ও উদ্যোক্তার মেধা, শ্রম ও সামাজিক পদমর্যাদাকে অস্বীকার করেনি ইসলাম। চাপিয়ে দেয়নি নিপীড়নমূলক কোনো ব্যবস্থা। বরং তার ভেতর মানবিক মূল্যবোধ ও শ্রমিকের প্রতি মমতা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা জীবনোপকরণে তোমাদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে তারা তাদের অধীন দাস-দাসীদের নিজেদের জীবনোপকরণ থেকে এমন কিছু দেয় না; যাতে তারা তাদের সমান হয়ে
রাসূল (সা.) এর কাছে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে, তার চুল উশকোখুশকো। মুখাবয়বে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। রাসূল (সা.) এর সামনে হাত বাড়িয়ে সে বলল, ‘আমাকে কিছু খেতে দিন। রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন তোমার কি কিছুই নেই সে বলল আমার একটি কম্বল আছে। রাসূল (সা.) বললেন যাও কম্বলটি নিয়ে এসো। কম্বল নিয়ে এলে রাসূল (সা.) তা নিলামে বিক্রি করলেন দুই দিরহামে। এক দিরহাম তাকে দিয়ে দিলেন পরিবারের খাবার আনতে আর এক দিরহাম দিয়ে কুড়াল কিনে নিজ হাতে তাতে হাতল লাগালেন; আর ওই লোককে বললেন কাঠ কেটে উপার্জন করো।
মানুষ ও রাষ্ট্রের উন্নতির চাবিকাঠি হলো শ্রম। যে জাতি যত বেশি উদ্যমী ও পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ। অর্থনীতির পরিভাষায়, যারা শ্রম দেন, তারা শ্রমিক। আর যারা শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ করেন এবং শ্রমের বিনিময়ে বেতন-ভাতা প্রদান করেন, তারা মালিক। শ্রমিক মালিক সম্পর্কে ইসলাম দাসত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেনি দেখেছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। মালিক শ্রমিকের কর্তব্য ও অধিকার বিষয়ে ইসলাম দিয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
শ্রমের মূল্যায়ন
শ্রম দিতে কোনো নবীই কুণ্ঠাবোধ করেননি। সব নবীই কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা উপার্জন করেছেন। হযরত আদম (আ.) কৃষিকাজ করেছেন। হযরত নূহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি বা সুতারের কাজ করেছেন। হযরত ইদ্রিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করতেন। হযরত সুলাইমান (আ.) সম্রাট হযরত দাউদ (আ.) লৌহশিল্প বা কামারের কাজ করতেন। হযরত শুআইব (আ.) এর খামারে হযরত মূসা (আ.) ৮-১০ বছর চাকরি করেছেন। এমনকি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)ও খাদিজা (রা.) এর অধীনে চাকরি করেছেন দীর্ঘকাল। তিনি বলেছেন নিজ হাতে কাজ করার মাধ্যমে উপার্জিত খাদ্যের থেকে পবিত্র কোনো খাদ্য নেই’ (বুখারি)।
হালাল উপার্জনের ব্যস্ততাকে আল্লাহর পথে থাকার সমতুল্য বলেছেন রাসূল (সা.) এক লোক তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সাহাবায়ে কেরাম লোকটির সুঠাম দেহ দেখে বলতে লাগলেন এই লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে থাকত, রাসূল (সা.) বললেন লোকটি যদি তার ছোট ছোট সন্তান অথবা তার বৃদ্ধ মাতা-পিতার জন্য উপার্জন কিংবা নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখতে উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে, তাহলে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে।
আরও একটি জায়গায় তিনি বলেছেন যে ব্যক্তি শ্রমজনিত কারণে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যা যাপন করে, সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েই তার সন্ধ্যা অতিবাহিত করে।
শ্রমিকের অধিকার
পুঁজিবাদী এ পৃথিবীতে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট। যে শ্রমিকের ঘামে গড়ে উঠছে আধুনিক সভ্যতা, আধুনিক পৃথিবীর কাছে তারাই সবচেয়ে অবহেলিত। এ শ্রেণিবৈষম্য চূর্ণ করে ইসলাম ঘোষণা করেছে বৈষম্যহীন এক মানবিক মেনিফেস্টো। যার প্রতিটি ধারায় মানবিক দৃষ্টিকোণ ও মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান। কাউকে বঞ্চিত না করার নির্দেশনা।
১. শ্রমগ্রহীতার কাঁধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো শ্রমিকের মজুরি দেওয়া। রাসূল (সা.) বলেছেন তোমরা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করো তার ঘাম শুকানোর আগেই। যারা শ্রমিকের মজুরি আদায়ে টালবাহানা করে, তাদের সাবধান করে বলেছেন সামর্থ্যবান পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম বা অবিচার,
হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন কিয়ামতের দিন আমি তাদের বিরুদ্ধে থাকব, যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, মানুষকে বিক্রি করে এবং ওই ব্যক্তি যে কাউকে কাজে নিয়োগ করল, অতঃপর সে তার কাজ পুরোটা করল, কিন্তু সে তার ন্যায্য মজুরি দিল না
২. শ্রমগ্রহীতার জন্য আবশ্যক হলো শ্রমিকের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিংবা অক্ষম বানানোর মতো কোনো কাজে তাকে বাধ্য না করা।
হযরত শুআইব (আ.) হযরত মূসা (আ.) কে কাজে নিয়োগ দেওয়ার সময় বলেছিলেন আর আমি আপনাকে কষ্টে ফেলতে চাই না ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে কল্যাণকামী রূপে পাবেন (সূরা-২৮ কছাছ, আয়াত: ২৭)।
রাসূল (সা.) বলেছেন শ্রমিকরা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা যার ভাইকে তার দায়িত্বে রেখেছেন, সে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে, সে যা পরিধান করবে তাকেও তা পরিধান করাবে, তাকে এমন কষ্টের কাজ দেবে না যা তার সাধ্যের বাইরে, কোনো কাজ কঠিন হলে সে কাজে তাকে সাহায্য করবে।
৩. শ্রমগ্রহীতার আরেকটি কর্তব্য হলো শ্রমিককে আল্লাহর ফরজকৃত যাবতীয় ইবাদত, যেমন সালাত ও সিয়াম পালনের সুযোগ দেওয়া। উপরন্তু শ্রমগ্রহীতা শ্রমিককে তার ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করবেন। তাদের ধর্ম পালনে সহায়ক হবেন। যেমন রমজানে কাজ কমিয়ে দেওয়া, ইফতার-সেহরির সময় দেওয়া। রাসূল (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি রমজান মাসে তার কাজের লোকের কাজ কমিয়ে সহজ করে দিল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার হিসাব সহজ করে দেবেন।
৪. শ্রমগ্রহীতাকে শ্রমিকের অভিযোগ এবং বিচার চাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। হোক তা স্বেচ্ছায় কিংবা আদালতের ফায়সালায়। এতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা পায়, জুলুম বিদূরিত হয়। মালিক শ্রমিকের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পায়, অসন্তোষ দানা বাঁধে না।
পুঁজিবাদী সভ্যতা এগিয়ে যায়। পেছনে পড়ে থাকে কারিগর। পৃথিবীজুড়ে এ বৈষম্য থেকেই সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় আন্দোলন। বিচার চাইতে গিয়ে, অধিকার আদায় করতে গিয়ে বুলেটের আঘাতে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে কতপ্রাণ কিন্তু ইসলাম শ্রমিককে যে মমতা দিয়েছে, তা কেউ দিতে পারেনি। কোদাল কোপাতে কোপাতে এক সাহাবির হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন হাতে কিছু লেখা নাকি সাহাবি বললেন লেখা নয়, উপার্জনের জন্য পাথুরে ভূমিতে কোদাল কোপানোর দাগ। রাসূল (সা.) সাহাবির হাতের ওই কালো দাগে চুমু খেলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের প্রতি মমতার বিরল দৃষ্টান্ত।
ইমরান আহমদ উসমানী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ইসলামীক আলোচক
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply