কর্মকর্তা নেই বছরের পর বছর, জনবল সংকটে ব্যাহত সরকারি সেবা। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। কোনো দপ্তরে বছরের পর বছর নেই নিয়মিত কর্মকর্তা, আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল এতটাই কম যে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি দপ্তর ও অবকাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) (এসিল্যান্ড) পদটি বর্তমানে শূন্য। একইভাবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর ধরে নিয়মিত কর্মকর্তা ছাড়াই মৎস্য কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষা খাতেও রয়েছে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদটি প্রায় সাত বছর ধরে শূন্য বলে জানা গেছে। এতে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, বিদ্যালয় পরিদর্শন, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও তদারকিতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এলজিইডির উপজেলা কার্যালয়েও রয়েছে প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি। সীমিত জনবল নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলীকে দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্টসহ স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এ দপ্তরে জনবল সংকট থাকায় বিভিন্ন প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ও নেই উপজেলা পর্যায়ের কার্যক্রমেও রয়েছে জনবল সংকট। নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশনসহ জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা এ দপ্তরে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেবাপ্রাপ্তিতে ভোগান্তি বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এ ছাড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত কর্মকর্তা নেই। নারী উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ এ দপ্তরে দীর্ঘদিন কর্মকর্তা না থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তার পদটিও প্রায় ছয় মাস ধরে শূন্য। একইভাবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পদে প্রায় দেড় বছর ধরে নিয়মিত কর্মকর্তা নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ বিতরণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় সেবা কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
এর বাইরে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিল-ভাউচারসহ আর্থিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ সেবার ক্ষেত্রেও শাল্লার চিত্র হতাশাজনক। উপজেলায় বিদ্যুৎ বিভাগের নিজস্ব কোনো স্থানীয় কার্যালয় নেই। ফলে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সমস্যা, অভিযোগ কিংবা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে গ্রাহকদের অন্যত্র যোগাযোগ করতে হয়। এতে দ্রুত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
অন্যদিকে, উপজেলার ডাকঘর সেবাতেও নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ডাকঘরের কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে পরিচালিত হচ্ছে না। ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষকে মাত্র দুটি ব্যাংক শাখার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিতে হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের চাপ ও ভোগান্তি বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, একটি উপজেলায় যখন একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকে এবং কোথাও প্রয়োজনীয় জনবলও থাকে না, তখন এসব দপ্তরের মাধ্যমে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবেন কীভাবে?
হাওরবেষ্টিত ও যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকে তুলনামূলক দুর্গম শাল্লায় সরকারি সেবার উপস্থিতি অন্য অনেক এলাকার তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে দীর্ঘদিন কর্মকর্তা না থাকা এবং প্রয়োজনীয় জনবল সংকট অব্যাহত থাকায় সরকারি সেবার কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু দপ্তর স্থাপন করলেই হবে না; প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কাগজে-কলমে সরকারি দপ্তর থাকলেও বাস্তবে তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারি দপ্তরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াসচন্দ্র দাস বলেন, আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়েছি। দেখা যাক কী হয়। বিষয়টি আসলে আমারও খারাপ লাগে—এতগুলো অফিসার নেই।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply